আগের পোষ্টে লিখেছিলাম কিভাবে এবং কি কি বিষয় চিন্তা করে ওয়েবসাইটের জন্য ডোমেইন কিনতে হয়। আজকের পোষ্টে ওয়েব হোস্টিং নিয়ে কিছু আলোচনা করতে চেষ্টা করব।
ডোমেইন কিনবার পর যে ব্যাপারটি নিয়ে চিন্তা করতে হয় তা হল ওয়েব হোস্টিং। সহজ ভাষায় হোস্টিং কোম্পানিগুলো অর্থের বিনিময়ে আপনাকে তাদের সার্ভারে আপনার ওয়েবসাইটের ফাইল, ছবি, শব্দ, গান, ভিডিও রাখতে (আপলোড/upload) দেবে। ফলে সারা বিশ্ব আপনার ওয়েবসাইট দেখতে পাবে। এখন, পৃথিবীতে হাজার হাজার হোস্টিং কোম্পানি আছে, এবং তারা সবাই মোটামুটি একই ধরনের সুযোগ সুবিধা দিয়ে থাকে। তারপরে্ও কয়েকটি বিষয়ের উপর দৃষ্টি রাখতে হয়। নতুবা অযথা টাকা খরচই করে যাবেন, আর প্রতিশ্রুতি মতো সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন।

ওয়েব স্পেস / হোস্টিং স্পেস (web space/hosting space)
ওয়েব স্পেসকে আপনি অনেকটা আপনার হার্ডডিস্কের সাথে তুলনা করতে পারেন। হোস্টিং কোম্পানিগুলো মূল দায়িত্ব হলই আপনার ওয়েবসাইটকে সার্ভারে হোস্ট করবে। এখন ছোট একটি ওয়েবসাইটের জন্য ৫০ মেগাবাইটের সমান জায়গাই যথেষ্ট কিন্তু যদি আপনি আপনার ওয়েবসাইটে ছবি, গান, ভিডিও রাখতে চান তবে আপনাকে বড় ওয়েব স্পেসের দিকে নজর দিতে হবে। তবে নিরাপদে থাকার জন্য স্পেসের ক্ষেত্রে কমপক্ষে ৫০০ মেগাবাইট হওয়া উচিত। তবে যদি প্রাথমিক অবস্থায় ছোট আকারের হোস্টিং কিনেও ফেলেন, পরবর্তীতে আপনার হোস্টকে বলে আরও কিছু পয়সা বিনিময়ে স্পেস বাড়িয়ে নিতে পারবেন। এতে কোনো সমস্যা হবার কথা নয়।
ওয়েব ট্রাফিক / ব্যান্ডউইড (web traffic / bandwidth)
প্রতিবার পাঠক / দর্শক যতগুলো পেজ আপনার ওয়েবসাইট ভিজিট করে, ততগুলো পেজ, ছবি, গান, ভিডিও অর্থাৎ ওইসব পেজে যা কিছু আছে সবগুলোই পাঠকের কম্পিউটারে ডাউনলোড হয়। আর প্রতিটি ডাউনলোড এবং আপলোডের হিসেব হোস্টিং কোম্পানির কাছে থাকে। হোস্টিং কোম্পানিগুলো প্যাকেজ অনুযায়ী ব্যান্ডউইড বরাদ্ধ করে থাকে। যেসব ওয়েবসাইট নতুন কিংবা ভিজিটর কম, তাদের কম ব্যান্ডউইড লাগে। অন্যদিকে অধিক মাল্টিমিডিয়া সমৃদ্ধ অধিক ভিজিটর আসে এমন ওয়েবসাইটের ব্যা্ন্ডউইড বেশি লাগে। নতুন ওয়েবসাইটের জন্য নিরাপদে থাকতে ১ গিগাবাইট ব্যান্ডউইড ভাল। কোনো কোনো হোস্টিং কোম্পানি ১০০ গিগাবাইট থেকে আনলিমিটেড গিগাবাইটও দিয়ে থাকে। আমার সবচেয়ে লাভজনক এবং ব্যস্ত ওয়েবসাইটে কখনও কখনও দিনে ৩ গিগাবাইট ব্যান্ডউইডও লেগে যায়। সেজন্য আমি GoDaddy থেকে হোস্টিংয়ের আনলিমিটেড প্যাকেজটি কিনেছি।
আপটাইম রেইট (Uptime Rate)
একটি সফল ওয়েবসাইটের জন্য এই বিষয়টি খুবই জরুরি। হোস্টের সার্ভার যতক্ষন সচল থাকবে, আপনার ওয়েবসাইটও ততক্ষন সক্রিয় থাকবে। এটা কেবলমাত্র পাঠকের জন্যই গুরুত্বর্পূণ নয়, বরং সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশনেও অনেক গুরুত্ববহন করে। পাঠক একবার আপনার ওয়েবসাইটে আসে দেখলো আপনার ওয়েবসাইট কাজ করছে না, তখন তার মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হবে এবং সে ভবিষ্যতে নাও আসতে পারে। ঠিক তেমনি সার্চ ইঞ্জিনের বট ইনডেক্সের সময় ওয়েবসাইট ডাউন থাকলে, সে ফিরে যাবে এবং আপনি আপনার ওয়েবসাইট ইনডেক্স হওয়া থেকে বঞ্চিত হবেন।
এখন প্রতিটি হোস্টিং কোম্পানিই ৯৯.৯৯% টাইম সক্রিয় থাকার প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু এদের প্রকৃত আপটাইমের হিসেব পাওয়া সম্ভব নয়। তবে কিছু কিছু নিরপেক্ষ ওয়েবসাইট আছে যারা বড় বড় হোস্টিং কোম্পানির তথ্য সংগ্রহ করে তুলনামূলক চিত্র প্রকাশ করে, হোস্টিং কেনার আগে সেগুলো ওযেবসাইটের শরনাপন্ন হওয়া যেতে পারে।
কাস্টমার সার্ভিস (Customer Service)
ওয়েব হোস্টিংয়ের ক্ষেত্রে কাষ্টমার সার্ভিসের মান খুব গুরুত্বপূর্ণ্ কাষ্টমার সার্ভিস সবর্দা প্রয়োজন হয় না কিন্তু যখন প্রয়োজন হয় তখন তৎক্ষনাত সাড়া না পাওয়া পেলে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। আগে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের কাষ্টমার সার্ভিসে সরাসরি যোগাযোগে টেলিফোন নম্বর দেয়া থাকতো। এখন কয়েকটি বাদে প্রতিটিই টিকেট পদ্ধতি শুরু করেছে। সমস্যা হলে টিকেট ইস্যু করলে তারা সমস্যা সমাধান দিয়ে থাকে। তবে এই পদ্ধতিটি আমি ব্যক্তিগত পছন্দ করি না। কারন পদ্ধতিতে অনেক সময় সময়মতো কাস্টমার সার্ভিসের সাড়া পাওয়া যায় না।
ডাটাবেজ এবং ল্যাঙ্গুয়েজ সাপোর্ট
প্রায়ই ক্রেতারা একটি সমস্যার সম্মুখীন হন তা হল স্বল্পসংখ্যক ডাটাবেজ সুবিধা। এখন ব্লগ, ফোরাম, ই-কর্মাস – প্রতিটি ওয়েবসাইটই ডাটাবেজ ব্যবহার করে। সেক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ডাটাবেজ না থাকলে একাউন্টে অতিরিক্ত ডাটাবেজ সংযোজন কিংবা একাউন্ট আপগ্রেডের পেছনে গুচ্ছের টাকা খরচ হতে পারে।
আবার কি ধরনের ওয়েবসাইট ব্যবহার করবেন – তার একটা প্রয়োজনীয় স্ক্রিপ্টের লিষ্ট দাঁড়া করানোর চেষ্টা করুন এবং পছন্দসই ওয়েবহোস্টিংয়ে দেয়া সুবিধার সাথে তুলনা করে দেখুন। এখন প্রতিটি হোস্টিংয়েই প্রায় সবগুলো স্ক্রিপ্টের সুবিধা পাওয়া যায়। তবে ই-কর্মাস কিংবা ভিডিও বিষয়ক ওয়েবসাইটগুলো কিছু অতিরিক্ত স্ক্রিপ্ট সুবিধার প্রয়োজন হতে পারে।
বিশেষায়িত হোস্টিং
আমরা সাধারনত যে হোস্টিংয়ের কথা বলে থাকি সেগুলো শেয়ার সার্ভার। অর্থাৎ আপনার ওয়েবসাইটের সাথে সাথে আরও অনেকে ওয়েবসাইটও থাকবে। ফলে সার্ভার ধীরগতির হতে পারে। এক্ষেত্রে ব্যস্ত ওয়েবসাইটগুলো Dedicated Server কিংবা Virtual Dedicated Server এ হোস্টিং ক্রয় করে। আবার ধরেন ইন্টারনেটে অবিরত রেডিও শোনার ব্যবস্থা করতে চান তবে আপনাকে Shoutcast Server কিনতে হবে।
আনলিমিটেডের ফাঁদ
এখন অনেক প্রতিষ্ঠানই ক্রেতাকে আনলিমিটেড স্পেস, আনলিমিটেড ব্যান্ডউইড, আনলিমিটেড ইমেইল ইত্যাদি সুবিধার টোঁপ দেয়। বড় প্রতিষ্ঠান না হলে কারোও পক্ষেই আনলিমিটেডের সুবিধা দেয়া সম্ভব নয়। বরং প্রতিষ্ঠানগুলো আনলিমিটেডের লোভ দেখিয়ে ধারনক্ষমতার অতিরিক্ত কাষ্টমার নিয়ে সার্ভার স্লো করে ফেলে। তাই দেখে শুনে কেবল প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলোর আনলিমিটেডের অফারে পা দিন।
অন্যান্য
ই-কর্মাস করতে না চাইলে SSL কিনবার কোনো প্রয়োজন নেই। হোস্টিং কোম্পানিগুলো মাঝে মাঝে অহেতুক হোস্টিং প্যাকেজের মধ্যে কিছু অতিরিক্ত ফিচার ঢুঁকিয়ে খরচ বাড়িয়ে দেয়। একটা খুবই দরকারি ফিচার অনেক সময়ই চোখ এড়িয়ে যায়। তাহলো কতগুলো ওয়েবসাইট একই হোস্টিং একাউন্টে হোস্ট করা যাবে। যেমন GoDaddy এর Economy Plan এ কেবলমাত্র একটি ডোমেইন ব্যবহার করে একটি ওয়েবসাইট হোস্ট করা যায়্ আর বাকি দুটোতে আনলিমিটেডের সুবিধা আছে। তাই সস্তা হলেও Economy Plan কেনা অযৌক্তিক।
আপনি যদি প্রোগ্রামিং কিংবা ওয়েবসাইটে পারদর্শী না হয়ে থাকেন, তবে Online Website Builder এবং One Click Installation ফিচারগুলো কাজে আসতে পারে। তাই হোস্টিং কিনবার পূর্বে দেখে নিন আপনার পছন্দের হোস্টিং প্রতিষ্ঠানটি সুবিধাগুলো দিচ্ছে কিনা?
ক্রেডিট র্কাড / পেপাল
বাংলাদেশে এই সমস্যাটি খুবই প্রকট। তবে ভাবনা কিছু নেই। ইন্টারনেটে কিংবা বিদেশি প্রতিষ্ঠান থেকেই যে হোস্টিং কিনতে হবে এর কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। স্থানীয় হোস্টিং প্রতিষ্ঠানগুলোতে যোগাযোগ করুন – তাদের তথ্য সংগ্রহ করে তুলনামূলক বিচারে সেরা প্রতিষ্ঠানটিকে চিহ্নিত করুন। যেই প্রতিষ্ঠানেই ডোমেইন -হোস্টিং কিনেন না কেন, প্রতিষ্ঠানটি ইতিহাস, বৈধতা সম্বন্ধে নিশ্চিত হয়েনি। কারন অনেক সময় কেনার সময় সমস্যা না হলেও পরবর্তীতে মেয়াদ বৃদ্ধির সময় ভোগান্তির শিকার হতে পারেন।
এ ধরনের আরও কিছু পোষ্ট:
- CSS এ Typography এর ব্যবহার – ওয়েব ডিজাইনারদের জন্য অবশ্য পাঠ্য
- বিজ্ঞপ্তি: ওয়েব সার্ভার পরিবর্তণ নোটিস
- কিভাবে PhpLD ওয়েব ডাইরেক্টরি সেটআপ করবেন?
- লক্ষ করুন | হোস্টিং নিয়ে কয়েকটি কথা
- ডোমেইন এবং হোস্টিং সমস্যার সমাধান
- আমি কেন ব্লগিংয়ের জন্য ওর্য়াডপ্রেস ব্যবহার করি ~ ওয়ার্ডপ্রেসই সেরা ব্লগিং প্লাটর্ফম
- [অতিথি পোষ্ট] ওয়েব ডিরেক্টরি: সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশনে উন্নতি ও অধিক ভিজিটর পাওয়ার একটি মাধ্যম
- ডোমেইন নেম নিয়ে কিছু প্রশ্নোত্তর ~ জেনে রাখা ভাল
{ 8 comments… read them below or add one }
অনেক উপকারী পোস্ট। এত দিন পড়া হয়নি আজ টেকটিউন-এ এটার লিংক থেকে পড়া হল।
.-= কবীর এর সর্বশেষ পোষ্ট >> Free Technique to get more visitor by using Email Newsletter Subscription =-.
ডোমেনর জন্যও কি প্রতি বছর ফি দিতে হয় ।
.-= Monir এর সর্বশেষ পোষ্ট >> Consolidations Loans =-.
ভালো পোষ্ট । বিশেষ করে নতুনদের জন্য দরকারী ।
.-= Monir এর সর্বশেষ পোষ্ট >> Consolidations Loans =-.
Dear Hasan vai
I’m sending this from my cell phone.Thats why it is possible to write in Bengali.
I’m really glad to you.I always eagerly wait for your post.It is so nice,informative.Thanks for that.Stay fine.Allah Hafez
মন্তব্যের জন্য অনেক ধন্যবাদ, আশা করি ভবিষ্যতেও লেখার মান বজায় রাখতে সক্ষম হবো।
ভাইয়া এক কথায় অসাধারন একটি পোষ্ট।
আচ্ছা ভাইয়া যদি অন্য ফ্রি কোন ওয়েবসাইটে ছবি আপলোড করে আমার ওয়েবসাইটে ব্যবার করি তাহলে কি ব্যান্ডউইড আমার খরচ হবে?
আর ভাইয়া আপনাকে একটা ইমেল করেছিলাম যদি একটু কষ্ট করে Reply দিতেন
অন্য সার্ভারে ছবি আপলোড করে নিজের সার্ভারের ওপর থেকে চাপ কমাতে পারবেন। তবে অন্য সার্ভার যে কোনোদিন আপনার সেই ছবি বিনা নোটিসে ডিলিট করে দেবে না, তার কি কোনো নিশ্চয়তা আছে?
আপনার ইমেইল পেয়েছি, আজ জবাব দিতে চেষ্টা করব।
মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।
আমার মন্তব্য হচ্ছে, আপনার পোস্টগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ, সহজ ভাষা এবং উপকারী পোস্ট হিসেবে এটিই সেরা। হোস্টিং-এর এই বিষয়গুলো সম্পর্কে আমার অস্পস্ট ধারণা ছিলো। আজ প্রায় অনেকগুলো ক্লিয়ার হয়ে গেলো। ধন্যবাদ হাসান ভাই।
ভবিষ্যতে আপনার কাছ থেকে হোস্টিং-এর সি-প্যানেলের ফিচার/ফাংশানগুলোর কোনটার কী কাজ সে বিষয়ে একটা পোস্ট চাচ্ছি। আশা করি খুব শিগগিরই পেয়ে যাবো। আবারও ধন্যবাদ হাসান ভাই। ভালো থাকুন…